তরুণ প্রজন্ম ভারতের কোনো দালালকে ক্ষমতায় যেতে দেবে না

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ৫৭

তরুণ প্রজন্ম ভারতের কোনো দালালকে ক্ষমতায় যেতে দেবে না
সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে ‘নজরুল ইসলাম থেকে হাদি: আজাদীর লড়াই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ছবি: আমার দেশ

তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশে ভারতের কোনো দালালকে ক্ষমতায় যেতেও দেবে না, ক্ষমতায় থাকতেও দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে কালচারাল রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা আয়োজিত ‘নজরুল ইসলাম থেকে হাদি: আজাদীর লড়াই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

জুলাই বাংলাদেশকে পাল্টে দিয়ে গেছে মন্তব্য করে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাই বাংলাদেশে এক নতুন তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টি করে গেছে। এই তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশে ভারতের কোনো দালালকে ক্ষমতায় যেতেও দেবে না, ক্ষমতায় থাকতেও দেবে না। আমাদের রাজনীতির থিউরিটাই পাল্টে ফেলতে হবে। থিউরি হবে ভারত যাকে সমর্থন করবে, তাকে ভোট দেওয়া যাবে না; ভারত যাকে সমর্থন করবে, তাকে ক্ষমতায় রাখাও যাবে না।

মাহমুদুর রহমান বলেন, শরীফ ওসমান হাদিকে সীমান্তের শকুনেরা হত্যা করেছে, যা হাদি তার লেখনির মধ্যেই বলে গেছেন। ফলে হাদির হত্যাকারীদের খোঁজার জন্য আমাদেরকে অনেক দূরে যাওয়ার দরকার নেই।

আমাদের লড়াইটা হাদি ঠিকই বুঝতে পেরেছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতার লড়াইটা যে প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক লড়াই, সেটা হাদি অনুভব করতে পেরেছিল। কারণ আমরা একটা ক্ষুদ্র দেশ, যেখানে বিশাল জনসংখ্যা। আমরা বৈরি প্রতিবেশী বেষ্টিত, সেই বৈরি প্রতিবেশির বিরুদ্ধে লড়াই করে যদি আমাদের স্বাতন্ত্র্য স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে হয়; তাহলে আমাদেরকে অবিরতভাবে সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

এই সাংস্কৃতিক লড়াই চালানোর জন্য হাদির স্বপ্ন ছিল কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাজেই ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারটা যদি বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাহলে হাদির বিদেহী আত্মা অন্তত বলবে আমরা অকৃতজ্ঞ ছিলাম না। ফলে এটাকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারাই এটাকে পরিচালনা করুক না কেন, সবার প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে এটাকে সহায়তা করার জন্য। সবাই যদি সহযোগিতা করেন, তাহলে এর কার্যক্রম চলমান থাকবে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাই বিপ্লব আমাদেরকে আবু সাঈদ থেকে ইয়ামিনসহ আরো অনেক আইকন দিয়ে গেছে। জুলাই বিপ্লবের পরে আল্লাহ ওসমান হাদিকে আমাদের আইকন হিসেবে দিয়েছেন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন ওসমান হাদির বিপ্লবের চেতনা অব্যাহত থাকবে। হাদি যে আদর্শ ও চেতনায় জীবন দিয়ে গেছেন, তা আমাদেরকে ধারণ করতে হবে। তবেই আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বৈরি প্রতিবেশীর আগ্রাসন থেকে নিরাপদ থাকবে।

আমার দেশ সম্পাদক বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিবার্চন আসবে তাতে বিভিন্ন দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে; আশা করি তাতে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা হবে। এক দল জিতবে, আরেকদল হারবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে জুলাই বিপ্লবের অংশীদার কেউ কারো শত্রুতে পরিণত হবে না। আমরা সম্মিলিতভাবে দেশ চালাব।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে মাহমুদুর রহমান বলেন, আমি আরেকটা আশা করব—কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিয়ে সওদা করবেন না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যও না, আবার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যও না। যারাই নির্বাচন করুক না কেন, একটা কথা বলব—বাংলাদেশের কিছু কিছু রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্নতা আছে। তারা মনে করেন, ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যায় না; আবার ক্ষমতায় গেলেও ভারতের সমর্থন ছাড়া নাকি টিকে থাকা যায় না। এটা তাদের হীনমন্নতা। কারণ কেবল ভারতের সমর্থনে যদি টিকে থাকা যেত, তাহলে শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্টকে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হতো না। ওসমান হাদি সবসময় হাসিনাকে একটা নামে ডাকত; ফেরাও হাসিনা। সেই ফেরাও হাসিনাও এখন পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে উল্টো কথা বলব। জুলাই বাংলাদেশকে পাল্টে দিয়ে গেছে। জুলাই বাংলাদেশে এক নতুন তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টি করে গেছে। সেই তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশে ভারতের কোনো দালালকে ক্ষমতায় যেতেও দেবে না, ক্ষমতায় থাকতেও দেবে না। সুতরাং রাজনীতির থিউরিটাই পাল্টে ফেলতে হবে। থিউরিটা হলো—ভারত যাকে সমর্থন করবে তাকে ভোট দেওয়া যাবে না; ভারত যাকে সমর্থন করবে তাকে ক্ষমতায় রাখা যাবে না।

বিদ্রোহী কবি নজরুল ও শহীদ শরীফ ওসমান হাদির মধ্যে অনেক সাদৃশ্য থাকার কথাও তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান।

কবি নজরুল ও শহীদ হাদির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আমার দেশ’র নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, কবি নজরুল ছিলেন বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কন্ঠস্বর; তার বিদ্রোহী কবিতা ও ধুমকেতুর মাধ্যমে তিনি পরাধীন শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার লড়াই করেছেন। আর আমাদের যে জুলাই আন্দোলন হয়েছে, তাতে নজরুলের কবিতা ছিল প্রধান চালিকা শক্তি। সেই আন্দোলনে নজরুলের গান ও কবিতা আমাদেরকে আলোড়িত করেছে, সংগ্রামকে তরান্বিত করেছে। সেখানে আমরা হাদিকে নজরুলের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেছি। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুল শব্দের হুংকার বাজিয়েছেন আর হাদি সেই কবিতাকে প্রাণবন্ত করে তুলে জুলাই আন্দোলনকে অন্যমাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, শহীদ সর্বদা দেশ ও দেশের জনগণের কথা চিন্তা করতেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুইদিন আগেও এক টেবিলে বসে আমাদের কথা হয়েছে—তাতে তিনি আগ্রাসনের শৃঙ্খলমুক্ত হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে দেখতে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কথা বলে গেছেন।

স্মৃতিচারণ করে তিনি আরো বলেন, শহীদ হাদির একটি বক্তৃতা খুবই মনে পড়ছে। হাদি বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া হাসলে বুঝবেন বাংলাদেশ ভালো আছে, তিনি কাঁদলে বুঝবেন বাংলাদেশ ভালো নেই। তেমনি তিনি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বলে গেছেন। ফলে তার চেতনাকে ধারণ করে আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

কালচারাল রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও ফয়েজ বিন আকরামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ‘নজরুল ইসলাম থেকে হাদি: আজাদীর লড়াই’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদির বড় ভাই শরীফ ওমর বিন হাদি, দৈনিক নয়া দিগন্তের সাহিত্য সম্পাদক কবি কাজী আবু জাফর।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক জাহিদুর রহমান, প্রফেসর শাহ মো. বুলবুল, রেজাবুদৌল্লাহ চৌধুরী, মুজিবুর রহমান, মুন্সী বোরহান মাহমুদ, তারিক হাসিব, সীমান্ত আকরাম প্রমুখ। হাদি ও নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা পাঠ করেন আজহারুল ইসলাম রনি ও সাব্বির আহমেদ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *